এনআরসি আতঙ্কে কাঁপছে কালিয়াচক


সৌজন্যে উত্তরবঙ্গ সংবাদ
রাজকুমার দাস, কালিয়াচক : মালদা থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে অসমে চালু হয়েছে এনআরসি। জাতীয় নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের। বিজেপি নেতৃত্ব ক্রমাগত হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছেন, পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি চালু করা হবে। তবে তার বিরোধিতা করে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজনৈতিক দলগুলির এই বিতন্ডায় রীতিমতো আতঙ্কিত জেলার কালিয়াচক সহ বিভিন্ন ব্লকের বাসিন্দারা। কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী প্রচার করে চলেছে, বাংলায় এনআরসি চালু হতে চলেছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না দেখাতে পারলে ভারতীয় হিসাবে থাকা নাগরিকত্ব খারিজ হতে পারে। আর এই গুজবের জেরেই কালিয়াচকের বিভিন্ন রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংক এবং ভূমিসংস্কার দপ্তর সহ পঞ্চায়েত অফিসগুলিতে প্রতিদিন হাজারের উপর মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন প্রযোজনীয় কাগজপত্র জোগাড় এবং সংশোধন করতে। স্থানীয় পঞ্চায়েত এবং ব্লক প্রশাসনের তরফে অবশ্য সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, অযথা আতঙ্কের কোনো কারণ নেই।
 Registered Now

এনআরসি থেকে বাদ পড়া নাগরিকরা নিজভূমে পরবাসী হয়ে বাস করছেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ, মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করাই এই এনআরসির প্রকৃত উদ্দেশ্য। সারা দেশজুড়ে বিতর্কিত এই বিষয় নিয়ে চর্চা চললেও কালিয়াচক-১ ব্লকের লক্ষাধিক মানুষ সরকারি এই সিদ্ধান্তে কার্যত নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছেন বলে দাবি অনেকের। বিশেষ করে সুজাপুর, গয়েরবাড়ি এবং নয়মৌজা এলাকার বাসিন্দারা চূড়ান্ত উদ্বিগ্ন। পুরোনো দলিল বা বসবাসের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করতে সব কাজ ফেলে হাজির হচ্ছেন সরকারি দপ্তরগুলিতে। স্টেট ব্যাংকের সুজাপুর শাখায় আধার কার্ড সংশোধন করতে হাজির হয়েছিলেন হাজারের ওপর মানুষ। অধিকাংশের আধার কার্ডেই জন্মতারিখ নেই। সেই জন্মতারিখ বসানো সহ অন্য সংশোধনের জন্যই তাঁরা হাজির হয়েছেন।
গয়েবারড়ি থেকে হাজির হয়েছিলেন ষাটোর্ধ্ব জুলফিকার আলি ভুট্টো। তিনি বলেন, আমার আধার কার্ডে জন্মের তারিখ ভুল রয়েছে। শুনেছি আধার কার্ডে ভুল থাকলে এনআরসিতে সমস্যা হতে পারে। আমাদের এখানে এখনও সরকারি কোনো নির্দেশিকা জারি হয়নি। কিন্তু চারিদিকে যেভাবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তাতে করে আগে থেকে সবকিছু ঠিক করে রাখতে চাই। সুজাপুর ভাগোটোলা থেকে এসেছিলেন আজিজা খাতুন। তিনি বলেন, এর আগে আমার আধার কার্ড একবার ঠিক করেছিলাম। তারপরেও জন্মতারিখ ভুল এসেছে। তাই আবার নতুন করে সংশোধনের জন্য এসেছি।
সুজাপুরের বাসিন্দা জব্বল শেখ বলেন, আমার আধার কার্ডে জন্মের বছর এবং তারিখ ঠিক নেই। একই সমস্যা আমার স্ত্রীরও। তাই আধার কার্ড সংশোধন করতে এসেছি, যাতে পরবর্তীতে ঝামেলার মধ্যে পড়তে না হয়। সুজাপুরের বাসিন্দা আসাদুল্লা মণ্ডল বলেন, অসমে এনআরসি নিয়ে নাকি ঝামেলা হয়েছে। এলাকার কিছু মানুষ বলছে, আমাদের রাজ্যেও নাকি এই প্রক্রিয়া চালু করা হবে। কাগজপত্র ঠিক না থাকলে দেশ থেকে নাকি তাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সব কাজ ফেলে আগে নাগরিকত্বের সমস্ত প্রমাণ ঠিক করতে শুরু করেছি।
বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের ম্যানেজার গৌতম দাসের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে যা বলার তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই বলবেন। কালিয়াচক-১ ব্লক তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতি সারিউল শেখ বলেন, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী কোনো অবস্থাতেই এই রাজ্যে এনআরসি চালু করতে দেবেন না। কিছু স্বার্থান্বেষী সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে তাঁদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। প্রশাসনের কাছে আমরা আবেদন করব, এদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

সুজাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান আরিফ আলি বলেন, এনআরসি নিয়ে আমাদের এলাকায় একটা গুজব ছড়িয়েছে। অনেকেই এসে পুরাতন দস্তাবেজ ঘেঁটে বার্থ সার্টিফিকেট চাইছেন। রাজস্বের পুরাতন রসিদের খোঁজ করছেন। বেশিরভাগ মানুষ ১৯৭১ সালের আগের প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র খোঁজ করছেন। সাধ্যমতো আমরাও তাঁদের সাহায্য করার চেষ্টা করছি। এছাড়াও সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন করছি গুজবে কান না দেওয়ার জন্য।
Previous Post Next Post