চাঁচল,লকডাউনে ভিক্ষায় বাধা, বৃদ্ধ আব্বাকে নিয়ে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন অন্ধ যুবক

chanchal news
চাঁচল 27 এপ্রিল : রাইসমিলে কাজ করতেন তিনি৷ বছর দুয়েক আগে হঠাৎ দুই চোখের দৃষ্টি চলে যায়৷ সাধ্যমতো চিকিৎসা হয়েছে৷ কিন্তু চোখের দৃষ্টি ফেরেনি৷ এরই মধ্যে মৃত্যু হয় আম্মার ৷ বাড়িতে এখন বৃদ্ধ আব্বা ৷ পাড়াপড়শিদের দয়াতেই পেট চলে দু’জনের৷ কিন্তু লকডাউনে প্রতিদিনের সেই জীবনযাত্রায় ছেদ পড়েছে৷ দুর্দিনে প্রতিবেশীরা এখন নিজেদের সংসার প্রতিপালনে ব্যস্ত৷ তাই এখন ঠিকমতো খাবার জুটছে না বৃদ্ধ আব্বা ও অন্ধ ছেলের ৷ কোনওদিন আধপেটা থাকতে হয় । আবার কেনওদিন বা শুধু জল খেয়েই দিন কেটে যায়৷ তাঁদের এই অবস্থার কথা জানতে পেরে গতকাল স্থানীয় কয়েকজন যুবক খাদ্যসামগ্রী দিয়ে আসেন । ফলে আগামী কয়েকটা দিন হয়ত সেই খাবারেই চলে যাবে । কিন্তু তারপর? এই প্রশ্নই এখন রোজ গিলে খাচ্ছে অন্ধ সামিউল আর তাঁর আব্বা ষাটোর্ধ্ব আব্বাস আলিকে ৷





চাঁচল 1 ব্লকের অলিহণ্ডা গ্রাম পঞ্চায়েতের কনুয়া গ্রামে বসবাস সামিউল ইসলামের ৷ 28 বছরের এই যুবক আগে এলাকারই একটি রাইসমিলে শ্রমিকের কাজ করতেন ৷ বছর দুয়েক আগে আচমকাই দু’চোখের দৃষ্টি চলে যায় তাঁর ৷ অভাবের সংসারে ভরসা সরকারি হাসপাতাল ৷ সেখানেই তাঁর চিকিৎসা হয়৷ কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও সুরাহা হয়নি ৷ দৃষ্টি ফেরেনি তাঁর । অন্যদিকে বাড়িতে বৃদ্ধ আব্বা রয়েছেন । তাই ভিক্ষাকেই জীবনযাপনের পথ হিসেবে বেছে নেন সামিউল । ভিক্ষা করে যা উপার্জন হত তাতে দুজনের কোনওরকমে চলে যেত৷ পাড়াপড়শিরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন৷ কিন্তু লকডাউন তাঁদের রোজনামচায় বাধা তৈরি করেছে ৷ এখন সামিউল ভিক্ষে করতে বাড়ির বাইরে যেতে পারেন না ৷ পুলিশ বাড়ি পাঠিয়ে দেয় ৷ স্থানীয় পঞ্চায়েতের তরফে সামান্য চাল আর আলু মিলেছিল ৷ সেটাও শেষ৷ এখন কার্যত অনাহারেই দিন কাটছে দু’জনের৷
সামিউল বলেন, "একদিন রাইসমিল থেকে কাজ সেরে বাড়ি ফিরে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি ৷ পরের দিন সকাল থেকে আর চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না ৷ অভাবের পরিবারে যতটা সম্ভব চিকিৎসা করেছি ৷ আমি আর কখনও চোখে দেখতে পাব কি না তা চিকিৎসকও বলতে পারেননি ৷ চিকিৎসক বলছেন, আমার মস্তিষ্কে নাকি টিবি হয়েছে ৷ সেই রোগ না সারলে কিছু করা যাবে না ৷ ওই রোগের জন্যই নাকি আমার দৃষ্টিশক্তি চলে গেছে ৷ সংসারে আমি আর আব্বা ৷ তাঁর বয়স 65 বছর ৷ কাজকর্ম করতে পারেন না ৷ এখন লকডাউন চলছে৷ আমি ভিক্ষেও করতে পারছি না ৷ রোজগার শূন্য ৷ কী করে খাবার জোগাড় করব বুঝে উঠতে পারছি না ৷ এখন আমার পড়শিরা খাবার দিচ্ছে ৷ কিন্তু তাঁদেরও তো অবস্থা খুব খারাপ ৷ প্রধান ও পঞ্চায়েত সদস্য যে খাবার দিয়েছিলেন তা শেষ হয়ে গেছে৷ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর কোনও সাহায্য পাইনি ৷ এই অবস্থায় দু’বেলা খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করার জন্য সবার কাছে আর্জি জানাচ্ছি ৷"
একই বক্তব্য আব্বাস আলিরও ৷ তিনিও বলেন, "ছেলেটা এখন ভিক্ষে করতেও বেরোতে পারছে না ৷ ওর উপার্জনেই আমাদের দু’জনের পেট চলে৷ এখন ঘরে খাবার নেই ৷ এখনও পর্যন্ত আমি কোনও সরকারি ভাতা পাইনি ৷ অনেক ঘুরেছি৷ কাজ হয়নি ৷ এখন পড়শিদের উপর ভরসা করেই বেঁচে আছি ৷ কিন্তু এভাবে আর কতদিন থাকা যায়? তাই আমরা বেঁচে থাকতে প্রশাসনের কাছে কিছু সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছি ৷"
চাঁচলের মহকুমা শাসক সব্যসাচী রায়কে বিষয়টি জানানো হলে তিনি বলেন, "এমন ঘটনার কথা জানা ছিল না ৷ আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি ৷ লকডাউনে যেন কেউ অভুক্ত না থাকে তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ৷ এই পরিবারটিকেও সরকারি সহায়তা করা হবে ৷"
Previous Post Next Post